ধরুন, আপনার পৈতৃক জমির একটা অংশ প্রতিবেশী দখল করে বসে আছেন। আলোচনা হয়েছে, সালিশ বসেছে, কিছুই কাজে আসেনি। এবার আপনি আদালতে যাবেন বলে ঠিক করলেন।
এরপর কী হবে? অনেকেরই ধারণা, "মামলা করলাম, তারপর একদিন রায় হবে।" বাস্তবে মাঝখানে থাকে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট ধাপ — প্রতিটির নিজস্ব নিয়ম, নিজস্ব সময়সীমা, এবং নিজস্ব ফাঁদ। দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ (Code of Civil Procedure) সেই পুরো পথটিই এঁকে রেখেছে। চলুন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হাঁটা যাক।
প্রথমে ভাবুন: আদৌ মামলা চলবে তো?
আদালতে যাওয়ার আগে দুটো জিনিস দেখে নিতে হয়।
প্রথমটি হলো নালিশের কারণ বা cause of action — অর্থাৎ এমন ঘটনার সমষ্টি যা প্রমাণ করতে পারলে আপনি প্রতিকার পাবেন। কারণ অস্পষ্ট হলে আরজি শুরুতেই বাতিল হয়ে যেতে পারে।
দ্বিতীয়টি হলো তামাদি বা limitation। তামাদি আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী প্রতিটি ধরনের মামলার জন্য আলাদা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া আছে — চুক্তিভঙ্গের ক্ষতিপূরণে তিন বছর, চুক্তি বাস্তবায়নের মামলায় এক বছর, স্বত্বের ভিত্তিতে দখল পুনরুদ্ধারে বারো বছর। সময় পেরিয়ে গেলে আপনার দাবি যতই ন্যায্য হোক, আদালত তা শুনবেন না।
আর প্রতিপক্ষ যদি সরকার বা কোনো সরকারি কর্মকর্তা হন, তাহলে মামলা করার আগে দেওয়ানি কার্যবিধির ৮০ ধারা অনুযায়ী দুই মাসের নোটিশ দিতে হবে। এই ধাপ এড়িয়ে গেলে মামলাটি টেকে না।
কোন আদালতে যাবেন
দুই রকম এখতিয়ার মিলিয়ে আদালত ঠিক হয়।
আর্থিক এখতিয়ার নির্ভর করে মামলার মূল্যমানের ওপর। বর্তমানে সিভিল জজ আদালতে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের মামলা চলে; এর ওপরের মামলা যায় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে।
এখানে একটি হালনাগাদ তথ্য মনে রাখা দরকার। Civil Courts (Amendment) Act, 2026 (২০২৬ সনের ১২ নং আইন) দ্বারা "সহকারী জজ" ও "সিনিয়র সহকারী জজ" পদনাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে "সিভিল জজ" ও "সিনিয়র সিভিল জজ" করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর থেকে কার্যকর। পুরোনো বইপত্রে ও অনলাইনে এখনো আগের নামই পাবেন।
স্থানীয় এখতিয়ার ঠিক হয় কার্যবিধির ১৬ থেকে ২০ ধারা অনুযায়ী — স্থাবর সম্পত্তির মামলা সেই এলাকার আদালতে, যেখানে সম্পত্তিটি অবস্থিত; অন্য মামলা সাধারণত বিবাদীর বসবাস বা ব্যবসার স্থানে, কিংবা যেখানে নালিশের কারণ উদ্ভূত হয়েছে।
একটি কথা প্রায়ই ভুলে যাওয়া হয়: ১৫ ধারা বলে, যে আদালতের এখতিয়ার আছে তাদের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরের আদালতেই মামলা দায়ের করতে হবে।
আরজি — যেখানে মামলার ভিত গাঁথা হয়
আরজি বা plaint হলো বাদীর লিখিত বক্তব্য। Order VII Rule 1 অনুযায়ী এতে থাকতে হবে আদালতের নাম, উভয় পক্ষের নাম-ঠিকানা-পরিচয়, নালিশের কারণ ও তা কখন উদ্ভূত হয়েছে, আদালতের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠার তথ্য, মামলার মূল্যমান এবং সবশেষে প্রার্থিত প্রতিকার।
Order VI-এর নিয়ম অনুযায়ী আরজিতে কেবল ঘটনা লেখা হয় — আইনি যুক্তি বা সাক্ষ্য নয়। শেষে বাদীর সত্যপাঠ বা verification থাকতে হয়। যেসব দলিলের ওপর আপনি নির্ভর করছেন, সেগুলোর তালিকা ও কপি আরজির সঙ্গেই দাখিল করতে হয় (Order VII Rule 14) — পরে ইচ্ছেমতো দলিল যোগ করার সুযোগ সীমিত।
মূল্যমানের ভিত্তিতে কোর্ট ফি দিতে হয়। কোর্ট ফিস আইন, ১৮৭০ এবং সুট ভ্যালুয়েশন আইন, ১৮৮৭ এখানে প্রযোজ্য। মূল্যমান কম দেখিয়ে ফি বাঁচানোর চেষ্টা প্রায়ই বিপরীত ফল দেয় — বিবাদী আপত্তি তুললে মামলা পিছিয়ে যায়।
আর একটি সতর্কতা: Order VII Rule 11 অনুযায়ী নালিশের কারণ না থাকলে, প্রতিকার সঠিকভাবে না চাইলে, তামাদিতে বাধাগ্রস্ত হলে বা যথাযথ কোর্ট ফি না দিলে আদালত শুনানির আগেই আরজি খারিজ করে দিতে পারেন।
দাখিল ও সমন
আরজি দাখিল হলে (২৬ ধারা ও Order IV Rule 1) মামলাটি রেজিস্টারে নথিভুক্ত হয় এবং একটি নম্বর পায় — যেমন "দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ১২৩/২০২৬"।
এরপর আদালত বিবাদীর নামে সমন জারি করেন (Order V)। সমনে বলা থাকে, নির্দিষ্ট তারিখে হাজির হয়ে জবাব দিতে হবে। বিবাদী ইচ্ছাকৃতভাবে সমন এড়াতে চাইলে আদালত বিকল্প পদ্ধতিতে — বাড়ির দরজায় লটকে দিয়ে বা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে — জারির নির্দেশ দিতে পারেন (Order V Rule 20)।
জবাব বা লিখিত বিবৃতি
বিবাদীর পাল্টা বক্তব্যকে বলা হয় লিখিত বিবৃতি বা written statement (Order VIII)। সমন পাওয়ার পর সাধারণত ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এটি দাখিল করতে হয়; যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখাতে পারলে আদালত আরও ৩০ কার্যদিবস পর্যন্ত সময় বাড়াতে পারেন।
লিখিত বিবৃতিতে আরজির প্রতিটি অনুচ্ছেদ সুনির্দিষ্টভাবে স্বীকার বা অস্বীকার করতে হয়। যা অস্বীকার করা হয় না, তা স্বীকৃত বলে ধরে নেওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিবাদী চাইলে এখানেই set-off বা পাল্টা দাবি (counter-claim) তুলতে পারেন।
কেউ যদি জবাবই না দেন? তখন আদালত Order VIII Rule 10 বা Order IX অনুযায়ী একতরফা শুনানি করে ডিক্রি দিতে পারেন। তবে যথাযথ কারণ দেখাতে পারলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন করে সেই একতরফা ডিক্রি রদ করানোর সুযোগ থাকে (Order IX Rule 13)।
মধ্যস্থতার বাধ্যতামূলক ধাপ
এখানে অনেকে অবাক হন — লিখিত বিবৃতি দাখিলের পর আদালত সরাসরি সাক্ষ্যে যান না।
৮৯ক ধারা অনুযায়ী, লিখিত বিবৃতি দাখিলের পর আদালত শুনানি মুলতবি রেখে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মধ্যস্থতা করবেন, অথবা বিষয়টি আইনগত সহায়তা কর্মকর্তা, পক্ষগণের আইনজীবী বা প্যানেলভুক্ত মধ্যস্থতাকারীর কাছে পাঠাবেন। ২০১২ সালের সংশোধনীতে "পারিবেন" শব্দটি বদলে "করিবেন" করা হয়েছে — অর্থাৎ এটি এখন ঐচ্ছিক নয়। তবে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর অধীন মামলা এর বাইরে।
আপিল পর্যায়েও একই সুযোগ আছে (৮৯গ ধারা)। মধ্যস্থতা সফল হলে বছরের পর বছরের মামলা এক বসাতেই শেষ হয়ে যেতে পারে — এবং কোর্ট ফি ফেরতের সুযোগও থাকে।
বিচার্য বিষয় স্থির করা
মধ্যস্থতা ব্যর্থ হলে আদালত পক্ষগণকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করেন (Order X), তারপর দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে ঠিক কোন কোন বিষয়ে মতভেদ আছে তা চিহ্নিত করে issue বা বিচার্য বিষয় গঠন করেন (Order XIV)।
এই ধাপটিকে খাটো করে দেখা ভুল। কারণ পরবর্তী পুরো বিচারকার্য এই ইস্যুগুলোর চারপাশেই ঘুরবে, এবং রায়ে বিচারক প্রতিটি ইস্যুর আলাদা উত্তর দেবেন। ভুলভাবে ইস্যু গঠিত হলে সঠিক বিষয়টি আদৌ বিচারেই আসে না।
সাক্ষ্য পর্ব
এবার প্রমাণের পালা। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী যিনি দাবি করেন, প্রমাণের ভার সাধারণত তাঁরই।
আগে পক্ষগণ একে অপরের কাছ থেকে তথ্য ও দলিল আদায়ের জন্য discovery ও inspection-এর আবেদন করতে পারেন (Order XI), এবং নির্ভরযোগ্য দলিলপত্র আদালতে দাখিল করেন (Order XIII)।
মূল শুনানিতে (Order XVIII) প্রথমে বাদীপক্ষের সাক্ষী, পরে বিবাদীপক্ষের সাক্ষী। প্রতিটি সাক্ষীর ক্ষেত্রে তিনটি ধাপ — জেরার আগে মূল জবানবন্দি, তারপর বিপক্ষের জেরা (cross-examination), প্রয়োজনে পুনঃজবানবন্দি। জেরাই বেশিরভাগ মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়; কাগজে-কলমে শক্ত মামলাও দুর্বল জেরায় ভেঙে পড়ে।
মামলা চলাকালীন অন্তর্বর্তী সুরক্ষা
মামলা শেষ হতে সময় লাগে। ইতিমধ্যে প্রতিপক্ষ যদি বিরোধীয় সম্পত্তি বিক্রি করে দেন বা নির্মাণকাজ চালিয়ে যান?
এজন্যই আছে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Order XXXIX) — প্রাথমিকভাবে দেখার মতো মামলা (prima facie case), সুবিধা-অসুবিধার ভারসাম্য এবং অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা — এই তিন শর্ত পূরণ হলে আদালত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন। টাকার দাবির মামলায় রায়ের আগেই সম্পত্তি ক্রোকের ব্যবস্থাও আছে (Order XXXVIII)।
রায় ও ডিক্রি
যুক্তিতর্কের পর আসে রায় (judgment) — যেখানে বিচারক ঘটনা, ইস্যুভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও কারণ লিপিবদ্ধ করেন।
রায়ের পর প্রস্তুত হয় ডিক্রি (decree)। ২(২) ধারায় ডিক্রিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে বিতর্কিত বিষয়ে পক্ষগণের অধিকার নির্ধারণকারী আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হিসেবে। ডিক্রিতে রায়ের তারিখই বসে (Order XX Rule 7), যদিও তা প্রস্তুত হয় কিছুদিন পরে।
কিছু মামলায়, যেমন বাঁটোয়ারা মামলায়, প্রথমে প্রাথমিক ডিক্রি হয় — কার কত অংশ তা নির্ধারিত হয়; পরে জরিপ ও ভাগ শেষে চূড়ান্ত ডিক্রি।
রায়ের পর: আপিল, না জারি?
হেরে গেলে সাধারণত আপিলের সুযোগ থাকে (৯৬ ধারা ও Order XLI)। যুগ্ম জেলা জজের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল মামলার মূল্যমান ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে জেলা জজ আদালতে, তার বেশি হলে হাইকোর্ট বিভাগে। সিভিল জজ ও সিনিয়র সিভিল জজের ডিক্রির আপিল যায় জেলা জজের কাছে। আপিলযোগ্য না হলে থাকে রিভিশন (১১৫ ধারা) বা রিভিউ (১১৪ ধারা ও Order XLVII)।
আর জিতে গেলে? জেতা আর পাওয়া এক জিনিস নয়। ডিক্রি বাস্তবায়নের জন্য আলাদা জারি মামলা করতে হয় (Order XXI)। ৫১ ধারা অনুযায়ী আদালত সম্পত্তির দখল অর্পণ, সম্পত্তি ক্রোক ও নিলাম, দেনাদারের গ্রেপ্তার ও দেওয়ানি আটক, কিংবা রিসিভার নিয়োগের মাধ্যমে ডিক্রি কার্যকর করতে পারেন।
সময়সীমা এখানে কঠোর। তামাদি আইনের ১৮২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রথম জারি আবেদন করতে হয় তিন বছরের মধ্যে; আর কার্যবিধির ৪৮ ধারা বলে, ডিক্রির তারিখ থেকে বারো বছর পেরিয়ে গেলে নতুন জারি আবেদনে আদালত আর আদেশ দেবেন না। হাতে ডিক্রি নিয়ে বসে থাকলে কাগজটি একসময় কেবল কাগজই থেকে যায়।
শেষ কথা
আরজি থেকে ডিক্রি — পথটা দীর্ঘ, কিন্তু এলোমেলো নয়। প্রতিটি ধাপের নিজস্ব যুক্তি আছে, আর বেশিরভাগ মামলা হারে তিনটি কারণে: দুর্বলভাবে লেখা আরজি, সময়সীমা মিস করা, আর জেরায় অপ্রস্তুত থাকা।
তাই আদালতের দরজায় পা রাখার আগে কাগজপত্র গুছিয়ে নিন, তামাদির হিসাব মিলিয়ে নিন, এবং একজন আইনজীবীর সঙ্গে বসে পুরো পথরেখাটা একবার দেখে নিন। মামলা শুরু করা সহজ; সঠিকভাবে শুরু করাটাই আসল কাজ।
সম্পাদনা বিভাগ
Written or edited by the Legally Yours editorial desk.
প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। জার্নালে লিখুন