এই লেখাটি শিক্ষামূলক উপকরণ। এটি আইনি পরামর্শ নয় এবং পাঠের মাধ্যমে কোনো আইনজীবী–মক্কেল সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না। কোনো ধারার উপর নির্ভর করার আগে তার বর্তমান পাঠ যাচাই করে নিন।
আদালতে প্রায়ই এই দৃশ্যটা দেখা যায়। বাদীপক্ষের আইনজীবী হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায় দেখিয়ে বলছেন, বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। বিবাদীপক্ষের আইনজীবী উঠে দাঁড়িয়ে হাইকোর্ট বিভাগেরই আরেকটি রায় দেখাচ্ছেন, যেখানে ঠিক উল্টো কথা বলা আছে। বিচারক দুটো রায়ই হাতে নিয়ে বসে আছেন।
এখন কী হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর আসে সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ থেকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, অনুচ্ছেদটি নিজে যতটা বলে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্ন সে খোলা রেখে যায় — আর সেই খোলা জায়গাগুলোতেই প্রতিদিনের প্র্যাকটিসের আসল লড়াইটা হয়।
অনুচ্ছেদ ১১১ কী বলে
সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ একটি বাক্য:
এখান থেকে তিনটি স্পষ্ট বিধান বেরিয়ে আসে।
এক, আপিল বিভাগের ঘোষিত আইন হাইকোর্ট বিভাগ মানতে বাধ্য।
দুই, আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ — উভয়েরই ঘোষিত আইন অধস্তন আদালতসমূহ মানতে বাধ্য।
তিন, বাধ্যকর হলো "ঘোষিত আইন" (law declared) — রায়ের প্রতিটি বাক্য নয়। এই তৃতীয় শব্দবন্ধটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অথচ সবচেয়ে কম আলোচিত।
এই কাঠামোটি কেন দরকার, তা বোঝা কঠিন নয়। একই আইনের একই ধারা যদি চট্টগ্রামে এক অর্থ বহন করে আর রংপুরে আরেক অর্থ, তাহলে সেটা আর আইন থাকে না। নজিরের বাধ্যবাধকতা আদালতের অহংকার রক্ষার জন্য নয়, বিচারপ্রার্থীর পূর্বানুমেয়তা (predictability) রক্ষার জন্য।
যা অনুচ্ছেদ ১১১ বলে না
লক্ষ করুন, অনুচ্ছেদটি কোথাও বলেনি যে হাইকোর্ট বিভাগের এক বেঞ্চের রায় হাইকোর্ট বিভাগের আরেক বেঞ্চের উপর বাধ্যকর। বলার কথাও নয় — কারণ হাইকোর্ট বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের "অধস্তন" নয়। দুটি একক বেঞ্চ বা দুটি দ্বৈত বেঞ্চ সমমর্যাদার (coordinate jurisdiction)।
তাহলে কি একটি বেঞ্চ ইচ্ছেমতো আরেকটি বেঞ্চের রায় উপেক্ষা করতে পারে?
না। এখানেই আসে বিচারিক শৃঙ্খলা (judicial discipline) ও সৌজন্যের নীতি (judicial comity)। প্রতিষ্ঠিত রীতি হলো — সমমর্যাদার কোনো বেঞ্চের পূর্ববর্তী রায়ের সাথে দ্বিমত থাকলে বেঞ্চ নিজে থেকে বিপরীত রায় দেবে না; বরং বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নিকট প্রেরণ করবে যাতে একটি বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে প্রশ্নটির নিষ্পত্তি করা যায়।
এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়, কিন্তু এটি ভাঙলে আইনের নিশ্চয়তা ভেঙে পড়ে। বাস্তবে আমাদের আদালতে এই রীতি সবসময় সমানভাবে অনুসৃত হয় না — এবং সেখান থেকেই ডিএলআর ও বিএলডি-তে পরস্পরবিরোধী রায়ের যে সারি তৈরি হয়েছে, প্র্যাকটিসে আমরা প্রতিনিয়ত তার মুখোমুখি হই।
রায়ের কোন অংশটি আসলে বাধ্যকর
একটি রায় বিশ পৃষ্ঠার হতে পারে। তার পুরোটাই "ঘোষিত আইন" নয়।
Ratio decidendi — অর্থাৎ সিদ্ধান্তের যুক্তিভিত্তি। মামলার স্বীকৃত ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে যে আইনগত নীতির উপর ভর করে ফলাফলটি এসেছে, সেটাই ratio, এবং সেটাই বাধ্যকর।
Obiter dicta — প্রসঙ্গক্রমে বলা কথা। আদালত হয়তো মন্তব্য করলেন, "যদি ঘটনা ভিন্ন হতো, তাহলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত"— সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে যে কথাটির প্রয়োজন ছিল না, সেটি obiter। এর মূল্য আছে, ওজন আছে, কিন্তু বাধ্যবাধকতা নেই। আপিল বিভাগের obiter অবশ্য বাস্তবে প্রায় বাধ্যকরের মতোই সম্মান পায়।
ratio খুঁজে বের করার একটি সহজ পদ্ধতি আছে। তিনটি ধাপে করুন:
১. আদালত যে ঘটনাগুলোকে প্রাসঙ্গিক (material) বলে গণ্য করেছেন, সেগুলো আলাদা করুন।
২. সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে আদালত যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তা চিহ্নিত করুন।
৩. এবার পরীক্ষা করুন — কোন প্রস্তাবনাটি বাদ দিলে সিদ্ধান্তটি আর দাঁড়ায় না? সেটিই ratio।
এই অনুশীলনটি না করে শুধু হেডনোট পড়ে নজির দাখিল করা আমাদের বারে খুব সাধারণ একটি ভুল। হেডনোট রিপোর্টারের লেখা; সেটি আইন নয়।
দুটি ধারালো অস্ত্র: per incuriam ও sub silentio
বিপক্ষের দাখিল করা নজির যখন আপনার বিরুদ্ধে যাচ্ছে, তখন এই দুটি যুক্তি কাজে লাগে। তবে দুটোই সাবধানে ব্যবহারের জিনিস।
Per incuriam — অসতর্কতাবশত প্রদত্ত রায়। কোনো রায় যদি প্রযোজ্য কোনো সুস্পষ্ট বিধিবদ্ধ বিধান বা বাধ্যকর নজির সম্পূর্ণভাবে বিবেচনার বাইরে রেখে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেটিকে per incuriam বলা যায় এবং তার বাধ্যবাধকতা থাকে না।
এখানে মূল কথাটা হলো — "আদালত ভুল করেছেন" আর "আদালত প্রযোজ্য বিধানটিই দেখেননি" — এই দুটো এক জিনিস নয়। প্রথমটি per incuriam-এর যুক্তি নয়, ওটা আপিলের যুক্তি। আপনি যদি per incuriam দাবি করেন, তাহলে আপনাকে দেখাতে হবে ঠিক কোন ধারা বা কোন রায়টি আদালতের সামনে ছিল না।
Sub silentio — যে প্রশ্নটি আদালতের সামনে উত্থাপিতই হয়নি, শুনানি হয়নি, বিবেচিতও হয়নি, অথচ ফলাফলে যেন প্রচ্ছন্নভাবে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলে মনে হয়। এমন বিন্দুতে ওই রায় নজির হিসেবে গণ্য হয় না। যুক্তি-তর্ক ছাড়া কোনো প্রশ্ন সিদ্ধান্তের মর্যাদা পায় না।
আপিল বিভাগ কি নিজের রায়ে বাধ্য?
অনুচ্ছেদ ১১১ আপিল বিভাগকে নিজের পূর্ববর্তী রায়ে আবদ্ধ করেনি। কিন্তু আপিল বিভাগ সাধারণত নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন না — সরেন কেবল যথেষ্ট শক্ত কারণ থাকলে, এবং প্রায় সবসময়ই বৃহত্তর বেঞ্চের মাধ্যমে। কারণটা সহজ: সর্বোচ্চ আদালত যদি ঘন ঘন অবস্থান বদলান, তাহলে নিচের পুরো ব্যবস্থাটাই দিশাহীন হয়ে পড়ে।
এর পাশাপাশি রয়েছে অনুচ্ছেদ ১০৫-এর রিভিউ এখতিয়ার — নিজের রায় পুনর্বিবেচনার সাংবিধানিক পথ।
বিদেশি রায়ের অবস্থান
ভারতীয়, পাকিস্তানি বা ইংরেজ আদালতের রায় বাংলাদেশে বাধ্যকর নয় — একটিও নয়। অনুচ্ছেদ ১১১ কেবল আমাদের সুপ্রিম কোর্টের কথা বলেছে। এগুলোর মূল্য persuasive, অর্থাৎ যুক্তির জোরে যতটুকু গ্রহণযোগ্য, ততটুকুই।
তবু আমাদের আদালতে এগুলো প্রায়ই কাজে লাগে, কারণ দণ্ডবিধি, সাক্ষ্য আইন, ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি — এদের উৎস অভিন্ন। কিন্তু দাখিল করার সময় একটি বাক্য যোগ করে দেওয়া ভালো: এই রায়টি বাধ্যকর নয়, কিন্তু যুক্তিটি প্রযোজ্য। বিদেশি রায়কে বাধ্যকর হিসেবে উপস্থাপন করলে আদালতের আস্থা হারানোর ঝুঁকি থাকে।
অধস্তন আদালতের সামনে যখন দুটি বিরোধী রায়
শুরুর দৃশ্যে ফিরি। বিচারক কী করবেন?
প্রথমেই দেখুন বেঞ্চের শক্তি। বৃহত্তর বেঞ্চের রায় ছোট বেঞ্চের রায়ের উপর প্রাধান্য পাবে। ফুল বেঞ্চ ডিভিশন বেঞ্চের উপরে, ডিভিশন বেঞ্চ একক বেঞ্চের উপরে।
দ্বিতীয়ত, দেখুন আপিল বিভাগ বিষয়টি স্পর্শ করেছেন কি না। করে থাকলে বিতর্ক সেখানেই শেষ।
তৃতীয়ত, দুটি রায় যদি সমমর্যাদার হয়, তাহলে দেখুন সেগুলো আসলেই বিরোধী কি না — নাকি ঘটনাগত পার্থক্যের কারণে দুটোই সঠিক (distinguishing)। বেশিরভাগ "বিরোধ" এখানেই মিটে যায়।
চতুর্থত, সত্যিকারের বিরোধ থাকলে সাধারণ চর্চা হলো পরবর্তী রায়কে অগ্রাধিকার দেওয়া, বিশেষত যদি সেখানে পূর্ববর্তী রায়টি বিবেচনা করা হয়ে থাকে। আর যদি পরবর্তী রায়ে পূর্ববর্তীটির উল্লেখই না থাকে, তখন per incuriam-এর প্রশ্নটি সরাসরি সামনে চলে আসে।
আইনজীবীর জন্য চেকলিস্ট
- নজির দাখিলের আগে ratio আলাদা করে চিহ্নিত করুন — হেডনোটের উপর ভরসা করবেন না।
- বেঞ্চের শক্তি ও রায়ের তারিখ যুক্তির অংশ হিসেবে বলুন।
- বিপক্ষের নজিরকে প্রথমে distinguish করার চেষ্টা করুন; per incuriam সবচেয়ে শেষ অস্ত্র।
- রায়টি পরবর্তীতে বাতিল বা সংশোধিত হয়েছে কি না, যাচাই করুন।
- বিদেশি রায় হলে তা persuasive — স্পষ্ট করে বলুন।
শেষ কথা
অনুচ্ছেদ ১১১ মাত্র এক লাইনের বিধান, কিন্তু বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সংগতি (consistency) পুরোটাই এর উপর দাঁড়িয়ে। আর এই বিধানের প্রয়োগ যে জায়গাগুলোতে অস্পষ্ট — সমমর্যাদার বেঞ্চের বিরোধ, per incuriam-এর সীমা, অপ্রকাশিত রায়ের মর্যাদা — সেই জায়গাগুলোতেই একজন আইনজীবীর প্রস্তুতি তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।
পরের বার আদালতে দাঁড়িয়ে যখন কেউ একটি রায় হাতে তুলে ধরবেন, প্রশ্নটা করুন — এটি কে দিয়েছেন, কোন শক্তির বেঞ্চ, আর এর ratio ঠিক কী?
অ্যাডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট
khalidsaifullah098765@gmail.com
প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। জার্নালে লিখুন